Home জাতীয় একটু দেরিতেই তাঁদের অপূরণীয় ক্ষতি

একটু দেরিতেই তাঁদের অপূরণীয় ক্ষতি

29
0
বাবার সঙ্গে ছোট্ট খাদিজাছবি: সংগৃহীত

১০ বছরের খাদিজা পড়ত রাজধানীর জুরাইনের একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মা-বাবার একমাত্র সন্তান মেয়েটির জ্বর আসে গত ৭ সেপ্টেম্বর। প্রথমেই জ্বর ১০১ ডিগ্রি হলেও মা-বাবা ধারণা করেছিলেন হয়তো সাধারণ জ্বর। স্থানীয় চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী শুরু হয় চিকিৎসা। তবে জ্বরের চার দিনের মাথায় পেটে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হলে পরীক্ষায় ধরা পড়ে খাদিজা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত।

গত ১২ সেপ্টেম্বর সকালে খাদিজাকে পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তির পর ডেঙ্গু ওয়ার্ডে শুরু হয় চিকিৎসা। তবে খাদিজার রক্তে প্লাটিলেট কমার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় অন্যান্য শারীরিক জটিলতা। ভর্তি হওয়ার পরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় খাদিজা। একমাত্র সন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় আসাদ-রুবি খাতুন দম্পতি।

খাদিজার বাবা আসাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘কলিজার টুকরা মেয়ের জীবনটা কেড়ে নিল ডেঙ্গু। জ্বর ধরা পড়ার পর সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। মেয়ের ডেঙ্গু নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মিটফোর্ড হাসপাতালে আনলাম। কিন্তু মেয়েকে বাঁচাতে পারলাম না.

খাদিজার মা রুবি বলেন, ‘ডেঙ্গু জ্বরে মেয়েকে চিরদিনের মতো হারাতে হবে, কল্পনাতেও ছিল না। এই ডেঙ্গু আমাদের সোনার সংসারটা তছনছ করে দিল।’
দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে অব্যাহত করোনা মহামারির মধ্যে নতুন আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে ডেঙ্গু। চলতি বছর জুরাইনের ছোট্ট খাদিজার মতো ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৭৩ জন। ভুক্তভোগী পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর বেশির ভাগই প্রথম দু-তিন দিন বাসায় অবস্থান করেন। ডেঙ্গুর পরীক্ষাও করাননি। তবে জ্বরের মাত্রা যখন ১০৩ থেকে ১০৫ ডিগ্রি হয়, রক্তে প্লাটিলেট কমে যায়, শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়, তখন ডেঙ্গুর পরীক্ষা করানো হয়। কেউ কেউ ডেঙ্গু পজিটিভ আসার পরও বাসায় অবস্থান করেন। বেশির ভাগ রোগী শেষ মুহূর্তে হাসপাতালে যান। তবে চিকিৎসায়ও তাঁরা ভালো হননি। হাসপাতালেই মারা গেছেন।

একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতে, এ সময় জ্বর দেখা দিলে সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে ডেঙ্গু ও করোনার পরীক্ষা করাতে হবে। ডেঙ্গু পজিটিভ হলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। কারণ, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার পর অনেকের নানা ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। কেবল পরীক্ষা-নিরীক্ষায় রোগীর দেহে কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে, সেটি জানা সম্ভব। তখন চিকিৎসকের পক্ষে সঠিক ব্যবস্থাপত্র দেওয়া সম্ভব হয়।

মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী রশিদ-উন-নবী প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত জানুয়ারি থেকেই আমাদের হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা দিয়ে আসছি। বেশির ভাগ ডেঙ্গু রোগী কিন্তু চিকিৎসায় ভালো হয়ে বাসায় ফিরছেন। অবশ্য আমাদের হাসপাতালে ইতিমধ্যে ২২ জন ডেঙ্গু রোগী মারা গেছেন। তাঁদের তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যাচ্ছে, অনেক দেরিতে হাসপাতালে আনা হয়েছিল, অনেকের অবস্থাই তখন সংকটাপন্ন। তাই জ্বর, মাথাব্যথা, গায়ে র‍্যাশ, বমি বমি ভাব ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হবে। তাতে মৃত্যুঝুঁকি অনেক কমে আসে।’

ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১৭ হাজারের বেশি মানুষ। আক্রান্ত রোগীর সিংহভাগ (৮৩ শতাংশ) ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের মধ্যে ৮৮ শতাংশ চিকিৎসা নিয়েছেন এই নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে। এর আগে ২০১৯ সালে এক লাখের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ওই বছর ডেঙ্গুতে ১৪৮ জন মারা যাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here